গল্পঃ #প্রে*গ*নে*ন্ট


 গল্পঃ #প্রে*গ*নে*ন্ট

দ্বিতীয়পর্ব | ০২


একটা উনিশ বছরের মেয়ে প্রেগন্যান্ট অথচ ও দাবি করছে ওর সাথে কোনো ছেলের সম্পর্ক নাই এবং গর্ভে সন্তান আসার ব্যাপারটা এত সহজভাবে বর্ণনা করছে

যেন ডালভাত খাবার মত কিছু! 


কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। 


উর্মি বললো,

- 'কি ভাবছিস?'


জিজ্ঞেস করলাম,

- 'বাচ্চাটা কার?'


- 'তা জেনে তোর কাজ কি!'


- 'তাহলে আমাকে ডেকেছ কেন? যার বাচ্চা তাকে সঙ্গে নিয়ে হসপিটালে যাও।'


- 'যদি জানতাম দারুন একটা ব্যাপার হতো৷ কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে ড্রামাটিক ভঙ্গিতে বলতাম, ‘ওগো তুমি বাবা হতে চলেছ! যত তাড়াতাড়ি পারো আমাকে বিয়ে করে উদ্ধার করো।’ হি হি হি!'


উর্মি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরে।ওর হাসি দেখে রাগ সামলে রাখতে পারলাম না।


- 'ছিহ! তুমি এত নীচ!'


- 'আমি নীচ নয় জঘন্য। তোর কি সমস্যা? তোর মন চাইলে আমার সাথে যাবি নয়তো ভাগ!'


অন্য কোনো ছেলে হলে ওখান থেকেই চম্পট দিত। কিন্তু আমি উর্মিকে এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে রেখে চলে যেতে পারলাম না।মেয়েটার সাথে আমার পরিচয় অল্প কিছুদিনের। সম্ভবত অল্প দিনের পরিচয়ে একজন আধচেনা মেয়েকে বিচার করা সম্ভব নয় কিন্তু উর্মি একা।ঠিক যতখানি একা হলে একজন মানুষ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে অশরীরী ভেবে ভয় পেয়ে যায় ততখানি একা।


আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত সংসারে সন্তানেরা ভাবি বাবা-মা সারাক্ষণ সন্তানের পিছু পিছু টিকটিক করে, ‘এই এত ফোন টিপিস না, এই শাকসবজি না খেলে পুষ্টি পাবি না, এই মাথায় তেল না দিলে চুল পরে যাবে, জ্বালাইয়া জীবন শেষ করেছিস।’ কথাগুলি শুনতে ভালো লাগে না সত্যি কিন্তু কতখানি ভালোবাসা মিশে থাকে আমরা কল্পনা করি না। সেই ছেলেমেয়েরা ভীষণ অভাগা যারা বাবার বকুনি আর মায়ের কড়া শাসন ছাড়াই একটু একটু করে বড় হয়ে যায় আর উর্মি তাদের দলে একজন।


.


আমাকে বিছানায় বসিয়ে রেখে উর্মি তৈরি হয়ে এল। ওর সাজ বলতে কোনোরকমে চুলে পলিটেইন বেঁধে গলায় স্কার্ফ জড়ানো।


ওর বাড়ি থেকে বের হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

- 'উবার ডাকবো?'


- 'উহু! বেবিটা পেটে আসার পর আমার গাড়ির গন্ধে বমি পায়। রিকশা নে।'


.


রিকশায় বসে ওর কনসিভ করার আদিনক্ষত্র সবটা জানলাম।উর্মিরা যাকে বলে কয়েক পুরুষের 'বনেদি বংশ৷' বাবা বিলেত থেকে এমবিএ করে এসে পারিবারিক ব্যবসা সামলান।মা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। টিভিতে পরিচিত মুখ, ব্লগ করেও বেশ জনপ্রিয়। উর্মি যে টুকটাক মডেলিংএর সুযোগ পায় তাও মায়ের কল্যাণে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উর্মিকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়।


মা চায় মেয়ে মায়ের মতই জনপ্রিয় হোক। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়ে প্রকৌশলী হবে। সবার স্বপ্ন চুরমার করে উর্মি অনেকটা জেদের বশেই বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। উর্মির আসলে পড়তে ভালো লাগে না। কিছুই ভালো লাগে না। 


ওর বাবা-মা উর্মির জন্মের পর আর কোনো সন্তান নিতে চান নাই যেন উর্মির যত্নে কোনো কার্পণ্য না হয়। সেই যত্ন এতখানিই উর্মির ঘরভর্তি বারবি ডল আর কাবার্ড ভর্তি জামাকাপড়।দুজন কাজের বুয়ার মেয়ের সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে মা ছুটতেন বিউটিপার্লারে। টিভির প্রোগাম যদি হয় আধাঘণ্টা তারজন্যে দুই ঘণ্টা ধরে চেহারাখানা দলাইমলাই করা চাই। বাবার তো একটার পর একটা বিদেশে মিটিং থাকত।


অনেক বছর পর উর্মি বুঝতে পারে, বিদেশ মিটিং, কনফারেন্সে শুধু ব্যবসায়িক কাজকর্মই হয় না তারসাথে বাবার সুন্দরী পিএর সাথে আলাদা কাজও থাকে।মা তাতে খুব বেশি বিরক্ত নন। ধনী স্বামীর বদৌলতে নামের সাথে মিসেস চৌধুরী যুক্ত হয়েছে। দামী গাড়ি, রঙবেরঙের কাঞ্জিভরম,জামদানি শাড়ির কালেকশন স্বামীর টুকিটাকি চরিত্রে দোষ ভুলিয়ে দেয়।তিনি নিজেও তো সতীসাবিত্রী নন কিছু রুপের গুণগ্রাহী বন্ধু জোঁকের ন্যায় পিছনে লেগেই থাকে। বন্ধুদের কাছে তিনি মিসেস চৌধুরী নন শিরিন বকুল কি না!


আর ভাইবোন হলে আদরের ভাগ হবে কথাটা ছিল ফাঁকি। তাদের দুজনের নিজেদের জীবন উপভোগ করতে কোনো সন্তানেরই প্রয়োজন ছিল না উর্মি জন্ম নেওয়াটা স্রেফ বংশরক্ষা। বাবা-মায়ের ডির্ভোস নেবারও প্রয়োজন হয় নাই কেননা দুজনের মাঝে বন্ধন থাকলে তো ছিন্ন হবে।


পাশাপাশি আলাদা দুই ঘরে দুজনে স্বর্গ রচনা করে বাস করছে।মধ্যিখানে উর্মি ভালো নেই। বাবা-মায়ের নিরুত্তাপ আর বন্ধুহীন জীবনে বিতৃষ্ণা হয়ে প্রায়ই ছুটে যায় শৈবালের ফ্লাটে। শৈবালের বাবা-মা আরো আধুনিক। তারা ছেলেকে আলাদা বাড়ি তৈরি করে দিয়ে ফ্রী জীবনযাপন করছেন। সেখানে প্রায়ই আফিমের আসর বসে। কিছু পথভ্রষ্ট ছেলেমেয়ে নেশায় চুড়চুড় হয়ে কয়েকঘণ্টার জন্যে এদুনিয়া দেশে হাজার সূর্যের দেশে উড়াল মারে। উর্মিরও হুশ থাকে না। মাঝরাত থেকে সকাল অবধি বিভোর হয়ে ঘুমায়।


তেমনি কোনো রাতে এক হারামি পেটে বাচ্চা দিয়ে ভেগেছে। এ নতুন কিছু নয়। এর আগেও শিমুল আন্টির মেয়ে 'জুন' শৈবালের বাড়ি এসে প্রেগন্যান্ট হয়ে ছিল।কেউ টের পায় নি,উর্মির সাথে ক্লিনিকে গিয়ে খালাস করে এসেছে।


.


যতক্ষণ উর্মি ওর গল্প বললো ততক্ষণ আর আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।সৃষ্টিকর্তা মানুষকে ঠিক কতরকম কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। উর্মির সব আছে কিন্তু আপন মানুষ বলতে কেউ নেই।


নামীদামী একটা ক্লিনিকের সামনে সিএনজি থামল। উর্মি এখানে আগেও কয়েকবার এসেছে বোঝা গেল। রিসেপশনিস্টের কাছে উর্মি ফিসফিস করে কিছু বলতেই আয়াকে ডেকে একজন নার্সের রুমে পাঠিয়ে দিল। ক্লিনিকে এধরনের  কেইস অহরহ আসে বোঝা যায়।


নার্স বললো,

- 'পাঁচ মিনিটের ব্যবসা। আপনার সাথে কে বয়ফ্রেন্ড?'


- 'না বন্ধু।'


- 'নার্স,বেবির হার্টবীট এসেছে?'


- 'আল্ট্রা করলে বোঝা যাবে। আপনি তো গর্ভপাত করাবেন এসব ভেবে লাভ কি!'


- 'কতমাসে হার্টবীট আসে?'


- 'সাধারণত আট থেকে দশ সপ্তাহের মাঝেই বোঝা যায়।'


- 'তারমানে এসেছে।'


উর্মি বেড থেকে বসে পরলো।

- 'কোন রুমে আল্ট্রা করায়?'


নার্স কি করবে বুঝতে না পেরে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।


আমি বললাম, 

- 'সিস্টার আপনি যান। আমি ওকে ম্যানেজ করছি।'


নার্স চলে গেলে উর্মির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,


- 'উর্মি, তুমি কি চাও?'


- 'শিশির, তুই তোর মাকে ভালোবাসিস?'


- 'এটা কেমন প্রশ্ন! হ্যা,খুব ভালোবাসি।'


- 'আমার মা একটা হারামি। তবু ওকে ঘৃনা করতে পারি না।'


- 'উর্মি তুমি একটা পাগল।'


- 'আমাকে কেউ কোনোদিন ভালোবেসে স্পর্শ করে নাই। এই বাচ্চাটা খুব ভালোবেসে আমার পেটে বড় হচ্ছে।'


- 'উমি ওর বাবা কে তুমি জানো না।'


- 'আমার বাপ কে তার ঠিক নাই শালা। মা দশ বেটার সাথে ঢলাঢলি করে। কার সন্তান চৌধুরীর ঘাড়ে 

চাপাইছে আল্লাহ মালুম।'


- 'উর্মি, প্লিজ।'


- 'আমি এসন্তান রাখবো। তারজন্যে বাড়িতে যতখুশি ফাইট করতে হোক করবো।'


.


উর্মিকে কোনোভাবে আমি বোঝাতে পারলাম না। উর্মি আল্ট্রা, ব্লাড টেস্টের রির্পোট নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে সিএনজিতে উঠলো।আমি জাস্ট রোবটের মত ওর কাণ্ডকারখানা দেখছিলাম। বাঁধা দিতে পারলাম না। ও সিএনজিতে বসেই আমার মুখে দিকে তাকিয়ে হাসল,


- 'কীরে ক্যাবলাকান্তের মত বসে আছিস কেন? বাসায় আজকে একটা সেই মজা হবে।'


- 'কি হবে?'


- 'প্রেগন্যান্সি পজেটিভ রির্পোট খাবার টেবিলের উপরে রেখে দিবো। মিস্টার অ্যাণ্ড মিসেস চৌধুরী যেই আগে দেখবে শকড্ হয়ে হার্টঅ্যাটাক করবে। হি হি হি। পৃথিবী থেকে একটা জঞ্জাল বিদায় হবে। হি হি হি!'


আমি ভয়ার্ত চোখে ওকে দেখতে থাকলাম।ওর মুখে কেমন একটা পৈশাচিক খেলা করছে। আমার ভয় হচ্ছে। ও কোনো বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে নাতো! 


(চলবে)...



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

Telegram

Join Our Telegram Channel!

আরো নতুন নতুন চটিগল্প পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হন। Tap below to join instantly!

Join Now
sr7themes.eu.org
🎉 প্রথমবার আমাদের সাইটে?

🎉আপনার জন্য $5 ফ্রি 💵 , simply click on below links. 👉 এখনই ক্লেইম করুন এবং উপভোগ করুন! 🚀, we don't sell anything. Thanks in advance for being with us.