গল্প: আমার সুলতানা সে পর্ব — ৮
গল্প: আমার সুলতানা সে
পর্ব — ৮
লেখিকা: সুমি আক্তার
রাত প্রায় নয়টা। মুবাশশিরা তার দুই দাদা—জাহাঙ্গীর কবির ও জাফর হোসেনের সঙ্গে খেলায় মেতে আছে। মুশফিকা সবে এশার নামাজ শেষ করে বসেছে, এমন সময় শাহিদা বেগম এসে বললেন—
"মুবাশশিরার দাদার জন্য শুকনা লাল মরিচ দিয়ে শুঁটকির ভর্তা বানিয়ে দাও।"
জাহাঙ্গীর কবিরের পছন্দের তালিকায় মুশফিকার হাতের বাটা ভর্তার আলাদা স্থান। ছোটা বোয়ার হাতের রান্না বা এমনকি শাহিদা বেগমের নিজের হাতের ভর্তাও তাঁর কাছে এতটা ভালো লাগে না। আসল কারণ ভিন্ন—পাটা-পুরা দিয়ে ভর্তা বানানোর ধকল শাহিদা বেগমের ভালো লাগে না। একদিন মুশফিকাকে একবার শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তারপর থেকেই দায়িত্ব তার ঘাড়ে।
এতিম মেয়ে বলে হয়তো তাদের কাছে এটা স্বাভাবিক—বাড়িতে খাওয়াবে, পড়াশোনা করাবে, আর কাজ করাবে। অথচ শেখবাড়ির সবাই জানে, মুশফিকা মুশফিক হাসানের আদরের মেয়ে, একসময়ের সচ্ছল পরিবারের সন্তান। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তার জীবন পাল্টে গেছে। ভাতের মাড় দিয়ে ক্ষুধা মেটানো, পুরনো কাপড় পরে থাকা, অসুস্থ হয়ে না খেয়ে শুয়ে থাকা—সবই তার জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রমজান মাসে রোজা রেখে ক্লাস নেওয়ার পরও বাড়ি ফিরে তাকে কাজ করতে হয়েছে। নিজের ঈদের কাপড়ও কিনেছে নিজ টাকায়—ভয়েল কাপড় কিনে হাতে সেলাই করে। এমনকি অসুস্থ থাকলেও কেউ জিজ্ঞেস করে না, ওষুধ খেয়েছে কি না। কাজের সামান্য গাফিলতিতে শাহিদা বেগমের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যেত, আর সেই মুখ দেখে মুশফিকা রোগা শরীর নিয়ে চুপচাপ কাজ করত।
মানুষের বড় পরিচয় কি শুধু পরিবার? যাদের পরিবার নেই, তারা কি কোনো পরিচয়বিহীন? সমাজের চোখে হয়তো তাই—তারা কেবল "এতিম", "অসহায়"—আনন্দের মুহূর্তে যাদের নাম থাকে না, থাকে কেবল দরকারের সময়।
সেদিনও পাটা-পুরা দিয়ে শুঁটকি ভর্তা বানাতে বানাতে হঠাৎই তীব্র ব্যথা শুরু হলো মুশফিকার পিঠে। দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, ঠোঁট কামড়ে ব্যথা সহ্য করল। কাজ শেষ করে চুপিসারে বিছানায় শুয়ে পড়ল, আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
হাতে ছিল মাত্র দুইশ টাকা। কয়েকদিন ধরে ফার্মেসির ওষুধ খেয়েও লাভ হয়নি। ভালো অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখানো জরুরি, কিন্তু টাকার অভাব তার পথ আটকে রাখল। কালকে কোনো শিক্ষিকার কাছ থেকে ধার করে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। মনে হচ্ছে, পিঠের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে।
---
পরদিন সকালে মুবাশশিরাকে খাইয়ে সামান্য খেয়ে গন্তব্যে বের হলো মা-মেয়ে। কিছুটা হেঁটে, কিছুটা কোলে নিয়ে এগোচ্ছিল। ব্রীজের ঢালে এসে আর হাঁটা সম্ভব হলো না, বসে পড়ল।
ঠিক তখনই কলেজে যাওয়া পথে রিয়াসা ও রিহানের চোখে পড়ে সে দৃশ্য—মুবাশশিরাকে কোলে নিয়ে ঢালে বসে আছে মুশফিকা। দৌড়ে এসে রিয়াসা মুবাশশিরাকে কোলে নিল—
"আপা, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছিলে?"
এমন সময় শেখবাড়ির দিকে যাওয়া জাফর হোসেনও এসে পড়লেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
"কি হয়েছে, এভাবে রাস্তায় বসে আছিস কেন?"
মুশফিকা কান্না চেপে বলল, "কয়েকদিন ধরে পিঠের ডান পাশে ব্যথা করছে। মেডিসিন খেয়েছি, কমে আবার বেড়ে যায়। আজ মুবাশশিরাকে কোলে নিয়েই প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে।"
জাফর হোসেন তৎক্ষণাৎ বললেন—"চল, এখনই ডাক্তারের কাছে যাব।"
মুশফিকা দ্বিধায়, "না চাচা, বিকালে যাব। এখন হাতে টাকা নেই।"
শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন জাফর হোসেন। চারপাশ নীরব হয়ে এলো, যেন সবার লজ্জা লাগছে নিজেদের জন্য।
শেষে জোর করে মুশফিকাকে হসপিটালে নিয়ে গেলেন তিনি। মুবাশশিরাকে সিয়ার কাছে দিয়ে গেল।
---
খবর পৌঁছে গেল মুয়াজ শেখের কানে। রিয়াসা আর রিহানের মুখ থেকে শুনল—রাস্তার ধারে বসে থাকা, ব্যথায় কাতর মুশফিকা, টাকার অভাবে ডাক্তার না দেখানো।
হসপিটালে গিয়ে দেখা গেল, ব্যথা ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণে। ডাক্তার বললেন—প্রেগন্যান্সির সময় যথেষ্ট খাবার না পাওয়ার ফল এটি। গুরুতর নয়, কিন্তু অবহেলায় বেড়ে গেছে। কয়েকদিন বিশ্রামে থাকতে হবে।
মুয়াজ নিঃশব্দে এসে নিঃশব্দে চলে গেল।
---
রাতে জোৎস্না ছড়িয়ে আছে আকাশে, কিন্তু মুয়াজের মন ভারী। জাফর হোসেন এসে বললেন—
"মুশফিকার সিলেটের সব সম্পত্তি আত্মীয়স্বজন দখল করে নিয়েছে। এক ইঞ্চি জমি রাখেনি ওর জন্য। মামার বাড়ির লোকও গাদ্দারি করেছে। এত কম বয়সে মেয়েটা শুধু নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। শেখবাড়ির কিছুই নেবে না সে, মুবাশশিরার জন্যই উত্তরাধিকার ফিরিয়ে আনতে চাইছে। আর আমরা? ওকে অবহেলা করেছি, জোর করে সিয়ামের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছি।"
মুয়াজ কোনো কথা বলল না। শুধু ওজু করে সিজদায় পড়ে গেল—
"আল্লাহ, আমার সুলতানার সব কষ্ট আমার শরীরে দিয়ে দাও। ওকে সুস্থ করে দাও। আমার শাহজাদী আর সুলতানাকে তোমার হেফাজতে রাখো।"
---
পাঁচ দিন পর, মুশফিকা কিছুটা সুস্থ। বিকেলে এক মহিলা এলেন—তার পুরনো পরিচিত, যার সাহায্যে মাদ্রাসায় পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। তিনি প্রস্তাব দিলেন, তার ছেলে মানসুর হক (জাপানে চাকরি করে) মুশফিকাকে বিয়ে করতে চায়, মুবাশশিরাসহ।
মুশফিকা পড়ল বিপাকে—একদিকে মুয়াজ শেখের অদম্য আগ্রহ, অন্যদিকে মানসুর হকের প্রস্তাব।
সিয়া খবর দিল রিহানকে, রিহান দৌড়ে পৌঁছে গেল দাদাভাইয়ের কাছে। মুয়াজ তখন "টুইন রোজ পেইন্টিং" করছিল। খবর শুনে তুলি হাতে বেরিয়ে এলো—
"এই কী সর্বনাশ! সুলতানার পা এখনো সাম্রাজ্যে পড়ল না, আর কোথাকার কে এসে হাজির!"
মুয়াজের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, পাঠক, তা কি আপনারা আন্দাজ করতে পারেন?
